এই দিনকাল: ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহেই ভারতে বসেছে ১৮ তম ব্রিকস সম্মেলন (BRICS)। সেই মঞ্চ থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়া ও ইরানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে সওয়াল করলেন তিনি।
শুক্রবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর কথায়, নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিরাপদ রাখতে হবে নাবিকদেরও। কারণ, সমুদ্রপথে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গেও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। গত চার বছর ধরে চলা সংঘাতের অবসানে আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মোদি বলেন, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। বিপদের মুখে পড়ছেন নাবিকরাও। তাই সংঘাতের সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রভাব ভারতেও পড়েছে। মস্কোর সঙ্গে ভারতের তেল বাণিজ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ তৈরি হয়েছে। জারি হয়েছে অতিরিক্ত শুল্কও। এর মধ্যেই ইউক্রেনের সংঘাতের জেরে ভারতীয় জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছেন ভারতীয় নাবিক। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে মোদির বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সরাসরি রাশিয়ার নাম না নিলেও ইউক্রেন সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের বার্তা কার্যত মস্কোর উদ্দেশেই দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শুধু রাশিয়া নয়, মোদির বক্তব্যের আরেকটি দিক ইরানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতের জেরে ওই জলপথে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও। ভারতের ক্ষেত্রেও হরমুজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে আসে। ফলে জলপথে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। গত কয়েক মাসে এই অঞ্চলে ভারতীয় তেলবাহী জাহাজও বিভিন্ন হামলার মুখে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনও দেশের নাম না করেই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ হোক কিংবা কৃষ্ণসাগর—কোনও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথই যেন সংঘাতের কারণে অচল না হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে সব পক্ষকেই নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ব্রিকসের অর্থনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নানা সংকটের মধ্যেও ভারত অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে এগিয়েছে ভারত। একইসঙ্গে স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলির জন্য বাজার, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিতে বসবাস করেন। বৈশ্বিক জিডিপিতে এই দেশগুলির অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ব্রিকসের অংশ ২৫ শতাংশের বেশি। ব্রিকস দেশগুলির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারও বিশ্ব গড়ের তুলনায় বেশি বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে প্রায় ২.৫ শতাংশ হারে বাড়ছে, সেখানে ব্রিকস দেশগুলির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ শতাংশ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন নমো। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্রিকস দেশগুলির অবদান প্রায় ৩৮ শতাংশ। সেখানে জি৭ দেশগুলির সম্মিলিত অবদান প্রায় ২৭ শতাংশ।