Dhirendra Krishna: ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের ছবি পোড়ানোর ঘটনায় কংগ্রেস নেতা অতনুর ৪ দিনের পুলিশ হেফাজত, সরব সুজন থেকে কুণাল

এই দিনকাল: ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর (Dhirendra Krishna) ছবি পোড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার কংগ্রেস নেতা অতনু দাসকে চার দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠাল আলিপুর আদালত। শুক্রবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হয়েছিল। তদন্তের স্বার্থে সাত দিনের হেফাজত চেয়েছিল পুলিশ। দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অতনুকে বুধবার রাতে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে বিধানসভা থেকে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

গ্রেফতারি বেআইনি, দাবি অতনুর আইনজীবীর

আদালতে অতনুর আইনজীবী গ্রেফতারির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও বক্তব্য বা ঘটনার প্রতিবাদ করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাঁর মক্কেল সেই অধিকারই প্রয়োগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। আইনজীবীর প্রশ্ন, ঘটনার সময় আরও যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের শনাক্ত করতে ভিডিয়ো ফুটেজ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তাহলে শুধু অতনুকেই হেফাজতে রাখার প্রয়োজন কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, অতনুকে বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়নি। রাতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে পুলিশ দরজায় ধাক্কা দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এজলাসের বাইরে অতনুর আইনজীবী আরও তীব্র ভাষায় পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, যিনি বাঙালিদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিবাদকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভা থেকে পুলিশকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে এভাবে বিধানসভা থেকে নির্দেশ দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত। আইনজীবীর আরও দাবি, অতনুর বিরুদ্ধে যে ধারাগুলি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলিও যথাযথ নয়। বিরোধীদের প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চলছে।

‘ঘটনার নেপথ্যের উদ্দেশ্য জানতে হবে’, আদালতে সরকারি আইনজীবী

সরকারের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল। তাঁর দাবি, অভিযুক্তরা শুধু ছবি পোড়াননি। তাঁরা পোস্টার পোড়ানো এবং জুতো দিয়ে আঘাত করার মতো ঘটনাতেও যুক্ত ছিলেন। আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে। একটি সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা ও গ্রেফতারি হয়েছে বলে আদালতে জানান সরকারি আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার পিছনে অভিযুক্তদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। সৌরীনের আরও বক্তব্য, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু অনুগামী রয়েছেন। এই ধরনের ঘটনা তাঁদের কাছে কী বার্তা পাঠায়, সেটিও তদন্তের বিষয়। তাঁর অভিযোগ, এই ঘটনায় রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জঙ্গি-যোগের আশঙ্কার দাবি

মামলাকারীর আইনজীবী আদালতে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ঘটনার পিছনে কোনও জঙ্গি সংগঠনের যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা দরকার। তিনি আনসারুল্লা এবং খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু অভিযুক্তদের পরিচয় বা নাম দেখে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা যায় না। তদন্তের সুযোগ না দিলে ঘটনার পিছনে আসল উদ্দেশ্য জানা সম্ভব নয় বলেও দাবি করেন তিনি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে জঙ্গি সংগঠনগুলির অর্থ আসার সম্ভাবনার কথাও আদালতে উল্লেখ করেন সরকারি আইনজীবী। তাঁর দাবি, অতীতে খাগড়াগড় কাণ্ডের তদন্তে দেশের বাইরে থেকে অর্থ আসার বিষয় সামনে এসেছিল। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বর্তমান ঘটনাতেও সব দিক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে আদালতে করা এই জঙ্গি-যোগের অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া

অতনুর গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। কংগ্রেস এই গ্রেফতারির তীব্র বিরোধিতা করেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ঘটনাটিকে ‘ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন’ বলে আক্রমণ করেছেন। সিপিএমও গ্রেফতারির প্রতিবাদ করেছে। দলের নেতা সুজন চক্রবর্তী এই ঘটনাকে অতীতের কার্টুন-কাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রকে রাজনৈতিক কার্টুন শেয়ার করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। জঙ্গলমহলের শিলাদিত্য চৌধুরীর গ্রেফতারির প্রসঙ্গও টেনেছেন তিনি। সিপিএম নেতার অভিযোগ, বর্তমান সরকার সেই সময়ের ঘটনাকেও ছাপিয়ে যেতে চাইছে।

কংগ্রেসের পাশে কালীঘাট তৃণমূল

অতনুর গ্রেফতারির বিরোধিতা করেছে কালীঘাট তৃণমূলও। দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করা ঠিক হয়নি। কুণালের প্রশ্ন, বাঙালিকে অপমানের অভিযোগে অন্যদের বিরুদ্ধে কেন একই ধরনের পদক্ষেপ হচ্ছে না। নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের তৃণমূল এই ঘটনায় তুলনামূলকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। দলের নেতা ঋজু দত্ত জানান, দুর্গাপুজো কীভাবে পালন করবেন, তা বাঙালিকে কারও কাছ থেকে শেখার প্রয়োজন নেই। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের মন্তব্যের বিরোধিতা তাঁরা আগেই করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসের প্রতিবাদের ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে আইন আইনের পথে চলবে বলেও জানান তিনি।

বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?

দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার খাওয়ার বিরোধিতা করে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়ান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। পুজোর সময় আমিষ খাওয়া বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বা ভণ্ড বলেছিলেন তিনি। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার ভবানীপুর থানার সামনে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা। সেখানে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের ছবি পোড়ানোর অভিযোগ ওঠে। ওই কর্মসূচিতে দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ প্রসাদের নেতৃত্বে অতনু দাস-সহ একাধিক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। এর পর বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুর থানার সামনে ছবি পোড়ানোর ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই পুলিশ সক্রিয় হয়। প্রকাশ্যে হেনস্থা, শান্তিভঙ্গের চেষ্টা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরির চেষ্টা এবং ঘৃণা ছড়ানোর মতো একাধিক অভিযোগে একাধিক কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এর পর বুধবার রাতে ক্ষেত্রমোহন নস্কর লেনের বাড়ি থেকে অতনুকে গ্রেফতার করে ভবানীপুর থানার পুলিশ। শুক্রবার আদালতের নির্দেশে আপাতত চার দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতেই থাকতে হবে তাঁকে। এখন তদন্তে পুলিশ কী তথ্য সামনে আনে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। একই সঙ্গে গ্রেফতারির বৈধতা নিয়ে অতনুর আইনজীবীর তোলা প্রশ্নও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Comment